থাকতে পার ঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া । আব্বাসউদ্দীন আহমদ (২৭ অক্টোবর ১৯০১ – ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৯) ছিলেন একজন বাঙালি লোক সঙ্গীতশিল্লী, সঙ্গীত পরিচালক, ও সুরকার। সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অফ পারফরম্যান্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন।
থাকতে পার ঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া লিরিক্স | Thakte Par Gatate Tumi parer Naiya Lyrics | Abbas Uddin Ahmed

থাকতে পার ঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া :
থাকতে পার ঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া
দীন বন্ধুরে, আমার দিন কি এমনি যাবে বইয়া
আমি দীন ভিখাড়ী পারের কড়ি ফেলাইছি হারাইয়া ।।
ও বন্ধুরে, কত জনায় নিলে তুমি উজানেত বাইয়ারে বন্ধু
আর আমি ভাটির বেলাই পার ঘাটাতে কান্দিগো দাঁড়াইয়া ।।
ও বন্ধুরে, পার হইতে পার ঘাটাতে দেখি যাইয়ারে বন্ধু
যত প্রেমিক জানে হইতাছে পার প্রেমের সারি গাইয়া ।।
ও বন্ধুরে, প্রেম নদীর তরঙ্গ ভারী কেমনে যাব বাইয়ারে বন্ধু
এ দীন ক্ষ্যাপা বলে, রইলাম আমি তোমার আশায় চাইয়া ।।
সঙ্গীত জীবন

কাজী মোতাহার হোসেন ও উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সাথে বর্ধমান হাউজ়ে (বর্তমান বাংলা একাডেমিতে) আব্বাসউদ্দীন আহমদ ( বামে) (১৯৫৫)
একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আব্বাস উদ্দীনের পরিচিতি দেশজোড়া। আধুনিক গান, স্বদেশী গান, ইসলামি গান, পল্লীগীতি, উর্দুগান সবই তিনি গেয়েছেন। তবে পল্লীগীতিতে তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি। গানের জগতে তার ছিল না কোনো ওস্তাদের তালিম। আপন প্রতিভাবলে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরেন।
তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লীগায়ের একজন গায়ক। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন। রংপুর ও কোচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, ক্ষীরোল, চটকা গেয়ে আব্বাস উদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি, সারি, ভাটিয়ালি , মুর্শিদি, বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালা গান ইত্যাদি গান গেয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি গানের সুর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও অদ্বিতীয়।

তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের সহায়তায় কলকাতায় এসে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান রেকর্ড করেন। তার প্রথম রেকর্ড ‘কোন বিরহীর নয়নজলে বাদল ঝরে গো’ এবং রেকর্ড করা গানের সংখ্যা কমপক্ষে সাত-শো। শহুরে জীবনে লোকগীতিকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব আব্বাসউদ্দিনের। আবার বাংলার মুসলমান সমাজকে উদীপ্ত করেছিলেন ইসলামি গান গেয়ে। পল্লীগীতির সংগ্রাহক কানাইলাল শীলের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। ক্ল্যাসিক্যাল গান শিখেছিলেন ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁর কাছে।
আব্বাস উদ্দিন ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো ছিল বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল। তাই অন্যান্য হিন্দু ধর্মের গায়করা মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকে। আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন।

এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাস উদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭ সালে) ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন।পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।
আব্বাস উদ্দিন সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেন : আব্বাস উদ্দিন কেবল গায়ক ছিলেন না, এই প্রজন্মের গায়করা যদি ভাবেন আব্বাস উদ্দিন শুধু গান গেয়ে এদেশের মানুষের মন জয় করেছেন তাহলে তা মস্ত বড় ভুল হবে।আব্বাস তার সময়কালের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন,সঙ্গে ছিলেন কাজী নজরুল এবং আরো অনেকে।“ তার সন্তান ফেরদৌসী রহমান এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসীও গান গেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন।
তার কিছু বিখ্যাত গান-
- ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’,
- ‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কারবা চলে নাও’,
- ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’