হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণদিবসে শ্রদ্ধাস্মরণ – ২৬ সেপ্টেম্বর

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯—এই দিনটি বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অপূরণীয় শূন্যতার দিন। সেদিন আমরা হারিয়েছিলাম এক কিংবদন্তিকে—কিন্তু হারাইনি তাঁর মানবিকতা, তাঁর বিনয়, তাঁর অমর সুরের উত্তরাধিকার।

আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে ফিরে দেখি সেই মানুষটিকে, যিনি খ্যাতির চূড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও সারা জীবনে মাটির গন্ধে ভেজা রইলেন, যার শিল্পী সত্তা আর মানবিকতা এক অপূর্ব সেতুবন্ধ রচনা করেছিল।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

মঞ্চের আলো পেরিয়ে—এক অসাধারণ মানুষের গল্প

গানের ওপারে যে মানুষটি থাকেন, তাঁকে কি আমরা সত্যিই চিনি? আলো, ক্যামেরা, প্রশংসার ঝলকানিতে ঘেরা জীবনেও যিনি সাধারণ মানুষের মতো সহজ ও সাধু চরিত্রে থেকেছেন—তিনিই তো প্রকৃত শিল্পী। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঠিক সেই মানুষ—রূপালি খ্যাতির কেন্দ্রবিন্দু হয়েও তাঁর হৃদয় ছিল সহজ, মমতাময়, সবার কাছে পৌঁছনো।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

ছাত্রদের সামান্য সম্ভাষণে কিংবদন্তির অশেষ মমতা

হুগলি মহসীন কলেজে এক অনুষ্ঠানের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল। শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রাপ্য ছিল অনেক বেশি, কিন্তু ছাত্রদের দেওয়া সামান্য সম্ভাষণ খাম দেখে সহশিল্পীরা রুষ্ট।

হেমন্ত হাসিমুখে বলেছিলেন—
“ছাত্ররা এর বেশি কোথায় পাবে? চলো, আজ এই টাকাতেই উৎসব হোক।”

সেই টাকায় আলুর চপ কিনে সহশিল্পীদের সঙ্গে আনন্দে ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি। খ্যাতির অহংকার নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর আসল পরিচয়।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

পরিবার থেকেই পাওয়া বিনয়, মূল্যবোধ ও শিকড়ের টান

শৈশবে দেখা ঠাকুমার অন্তিম মুহূর্ত, মায়ের সন্তানের প্রতি অনন্ত উদ্বেগ—এসবই তাঁর মননে গেঁথে দিয়েছিল জীবনবোধ। খ্যাতি যতই বাড়ুক, তিনি কখনও ভুলে যাননি কোথা থেকে এসেছেন। হয়তো এ কারণেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের মতোই সহজ ছিলেন।

বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অটল—পুরনো দিনের ‘হেমন্ত’

একদিন রাস্তায় হঠাৎ দেখা ছোটবেলার বন্ধু এস. কে. নন্দনের সঙ্গে— চারদিকে তখন তিনি ‘নাগিন’-এর সুপারহিট সুরকার, কোটি মানুষের আইকন। তবু গাড়ি থামিয়ে পুরনো বন্ধুকে ডেকে, লজ্জা ভুলিয়ে, জোর করে গাড়িতে তুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন গন্তব্যে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়—খ্যাতির আড়ালেও যিনি একই রকম রইলেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

সহমর্মিতা ও উদারতার আলো—নচিকেতা ঘোষের প্রতি আচরণ

নচিকেতা ঘোষকে বোম্বেতে আনা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু সত্য হলো—হেমন্ত নিজে উদ্যোগী হয়ে তাকে পথ দেখিয়েছিলেন, নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সমালোচনা তাঁকে বিচলিত করেনি; শিল্পীসুলভ মহত্ত্বই তাঁর পরিচয়।

মহালয়ার ইতিহাসেও তাঁর নীরব অবদান

মহালয়ার চণ্ডীপাঠের সঙ্গে তাঁর সুর যুক্ত হয়ে আছে চিরকাল। কিন্তু নিজের কথা নয়—তিনি বারবার শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন পঙ্কজ কুমার মল্লিকের নাম। “ছোট পঙ্কজ” হয়েও পরবর্তী সময়ে তিনি নিজের স্বকীয়তায় হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অন্যতম অমর কণ্ঠ।

মৃত্যুচেতনার গান—নশ্বরতার গভীর উপলব্ধি

জীবনের শেষভাগে তিনি গেয়েছিলেন—
“শ্মশানেতে কত লোক হবে…”

মনে হয়েছিল তাঁর, সময় কাছে এসে গেছে। গানেই তিনি রেখে গিয়েছিলেন প্রশ্ন— জীবিতকালের মতোই কি শেষ দিনেও মানুষের ভালোবাসা পাবেন?

উত্তর আমরা জানি—
হ্যাঁ, তিনি পেয়েছিলেন। তিনি এখনও পান।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

তিনি কি সত্যিই চলে গেছেন?

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯-এ তিনি দেহরূপে বিদায় নিলেও, সুররূপে আজও থমকে নেই কোথাও।
রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনি ফিরে আসেন—বারবার, প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি গানে।

ভোরের শুকতারা মুছে যায়, কিন্তু সন্ধ্যার আকাশে ধ্রুবতারার মতো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আজও দীপ্তমান।

আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন

একজন মানুষ, যিনি শিল্পীকে অতিক্রম করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন— যিনি আমাদের সঙ্গীত, সংবেদনশীলতা ও মানবিকতার মানচিত্র চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছেন।

তাঁর সুরেই বাঙালির হৃদয়ের নাভিমূলে আলো জ্বলে। তাঁর গানে এখনো আমরা পাই আশ্রয়, শান্তি, ভালোবাসা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়—আপনি নেই, তবু আছেন।

#HemantaMukhopadhyay #DeathAnniversary #26September #HemantKumar #BanglaGaan #LegendLivesOn #MusicalTribute