খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ১:৭ এএম

বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্পে এখন এক নতুন ধারা। গত কয়েক বছরে মিউজিক ভিডিও নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে বিশাল অঙ্কের টাকা, যা সিনেমার বাজেটকেও হার মানাচ্ছে। জি সিরিজ, ধ্রুব মিউজিক স্টেশন, সিএমভি ও সাউন্ডটেকের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো একটি একক প্রজেক্টের পেছনে রীতিমতো কোটি টাকা ঢালছে। যদি কোনো মিউজিক ভিডিওতে দেখা যায় চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় তারকাদের ঝলক অথবা বিদেশের মনোরম লোকেশন, সেক্ষেত্রে বাজেট সহজেই ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ছুঁয়ে ফেলছে, যা অতীতে ছিল অভাবনীয়।
এই বাজেট বৃদ্ধির পেছনে শিল্পীদের নিজস্ব বিনিয়োগও চোখে পড়ার মতো। বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ইমরান মাহমুদুল তাঁর গানগুলোর ভিডিও নির্মাণে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ফোক-ফিউশন ঘরানার গানের জন্য পরিচিত ঐশী তাঁর সাম্প্রতিক প্রজেক্টগুলোতে ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। কণ্ঠশিল্পী কণাও প্রায়শই তাঁর বিগ বাজেটের গানের ভিডিও দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন।
মিউজিক ভিডিওতে মোটা অঙ্কের এই বিনিয়োগ কেবল প্রযোজনা সংস্থা বা শিল্পীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের তারকাদেরও আকর্ষণ করছে। বিগত এক বছরে একাধিক গানে মডেল হিসেবে কাজ করে অভিনেত্রী অলঙ্কার চৌধুরী জানান, সেই গানগুলোর বাজেট ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। এমনকি সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি মিউজিক ভিডিওর বাজেট প্রায় ৩০ লাখ টাকা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নাটকে অভিনয়ের চেয়ে মিউজিক ভিডিওতে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়ায় তিনি ইদানীং অভিনয়ের চেয়ে এই মাধ্যমেই বেশি সময় দিচ্ছেন। অলঙ্কার চৌধুরী বলেন, “মিউজিক ভিডিওকে নেতিবাচকভাবে দেখার দিন শেষ। আমি যে ভিডিওগুলো করছি, সেগুলোর নির্মাণশৈলী ও গল্পের মান সত্যিই অনেক উন্নত। একটি ভালো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করলে অবিশ্বাস্য রকমের দর্শক সাড়া পাওয়া যায়, যা অনেক সময় দীর্ঘ নাটকেও মেলে না। এছাড়াও, নাটকের তুলনায় এই মাধ্যমে আয় কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে।”
অভিনেত্রী তানজিম সাইয়ারা তটিনীও বিগ বাজেটের মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তাঁর মতে, “মিউজিক ভিডিও এখন আর কেবল সস্তা নাচের জায়গা নয়, এখানে সূক্ষ্ম অভিনয়েরও প্রচুর সুযোগ আছে। যখন বড় বাজেট ও বড় নির্মাতারা এই কাজগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছেন, তখন ভালো গল্পে অভিনয় করার লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।” একসময় নাটক ছেড়ে সিনেমায় থিতু হওয়া অভিনেতা আফরান নিশোকেও নিয়মিতভাবে বড় বাজেটের মিউজিক ভিডিওর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “যখন নির্মাতারা ১০-২০ লাখ বা তারও বেশি বাজেট নিয়ে আমাদের কাছে আসেন, তখন বোঝা যায় যে তাঁরা কাজটি নিয়ে কতটা আন্তরিক।”
তারকাদের কথায় আয়ের সুযোগ বাড়ায় মিউজিক ভিডিওতে তাঁদের যুক্ত হওয়ার কারণ স্পষ্ট হলেও, এই বিশাল অঙ্কের লগ্নির মূল কারণ কী এবং সেই বিনিয়োগ আদৌ ফেরত আসছে কি না, তা নিয়ে সঙ্গীতপাড়ায় চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এ প্রসঙ্গে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ও সঙ্গীতশিল্পী ধ্রুব গুহ খোলামেলাভাবে বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মিউজিক ভিডিওতে বিনিয়োগ করেছি। তবে শুধু ভিউ বা স্ট্রিমিং থেকে এই বিশাল লগ্নির শতভাগ সরাসরি ফেরত পাওয়াটা প্রায় অলৌকিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় বাজেট করা হয় মূলত কোম্পানির ব্র্যান্ডিং এবং বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য।” তিনি আরও জানান, অনেক সময় এটি এক ধরনের ‘ফাঁকা আওয়াজ’ও বটে, কারণ লোকসানটা অন্য প্রকল্পের লাভ দিয়ে সমন্বয় করতে হয়। স্পন্সরশিপ না থাকলে স্রেফ ভিউয়ের ওপর নির্ভর করে ১০ লাখ টাকার ওপরে বিনিয়োগ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
নিজের গানের ভিডিওতে মোটা অঙ্কের বাজেট ঢেলে দেওয়া সঙ্গীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল বলেন, “আমি যে কাজগুলো করি সেগুলোতে কাস্টিং ও মেকিংয়েই ১০-১৫ লাখ টাকা সহজেই লেগে যায়। কেন এই বিনিয়োগ? কারণ দর্শক এখন শুধু গান শোনেন না, তাঁরা ভালো মানের ভিজ্যুয়ালও দেখতে চান। তবে টাকা সরাসরি ফেরত আসার সমীকরণটা সম্পূর্ণভাবে গানটির হিট বা ফ্লপের ওপর নির্ভর করে।” কণ্ঠশিল্পী কণা তাঁর ‘খামোখাই ভালোবাসি’ গানটির উদাহরণ দিয়ে বলেন, “এই গানের পেছনে প্রায় ২০ লাখ টাকা বাজেট রেখেছিলাম, যেখানে বিশাল ক্রোমা সেট আর থ্রিডি ভিএফএক্স-এর মতো কাজ করা হয়েছিল। এত খরচ করার কারণ ছিল, আমি এই শিল্পে আন্তর্জাতিক মান এনে একটি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। এখন প্রশ্ন হলো, টাকা কি ইউটিউব ভিউ থেকে ফেরত এসেছে? সরাসরি উত্তর, না।”
সঙ্গীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ এই প্রবণতার কারণ হিসেবে ইন্টারনেট ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থানকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “ইন্টারনেট ও ওটিটি আসার পর থেকেই আসলে মিউজিক ভিডিওর বিনিয়োগে জোয়ার এসেছে। আমি আমার নিজের ট্র্যাকগুলোতে বরাবরই আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে বড় খরচ করি, অনেক সময় দেশের বাইরেও শুটিং করি। তবে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার পদ্ধতিটা আগের মতো নেই। এখন ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন আর নিজস্ব চ্যানেলের সাবস্ক্রিপশনই মূল ভরসা। তবে একটি গান যদি সত্যিই ভালো হয়, তাহলে আজ হোক বা কাল, একাধিক উৎস থেকে টাকা ঠিকই ফেরত আসবে।”
সঙ্গীত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের মিউজিক ভিডিও শিল্প এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি পুরোপুরি ‘ফাঁকা আওয়াজ’ নয়, আবার শতভাগ নিট মুনাফার ব্যবসাও নয়। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট ও গ্ল্যামার গেম। বড় বাজেটের ভিডিওগুলো আসলে এক একটি বড় বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করছে, যা গানের অডিও স্ট্রিম এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারকে সচল রাখতে সাহায্য করছে।
আয়ের উৎস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি মিউজিক ভিডিওর প্রতি এক লাখ ‘লং-ফর্ম’ ইউটিউব ভিউতে (বিজ্ঞাপনের প্রকারভেদে) আনুমানিক ১০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। এছাড়াও, অডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ যেমন স্পোটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, অ্যামাজন মিউজিক এবং দেশীয় স্বাধীন অ্যাপে গানের রয়্যালটি বিক্রি আয়ের অন্যতম একটি মাধ্যম। পাশাপাশি, ভিডিওর ভেতরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিজিটাল প্লেসমেন্ট থেকে শুটিং শুরুর আগেই বাজেটের একটি বড় অংশ চলে আসে অনেক শিল্পীর। এর সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের ওয়েলকাম টিউন ও কলার টিউনের মাধ্যমেও বড় অঙ্কের টাকা ঘরে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তবে এই জোয়ারকে টেকসই করতে হলে কেবল ভিডিওর বাহ্যিক জাঁকজমকই যথেষ্ট নয়। অডিওর রয়্যালটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্পন্সরশিপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, এই বড় বাজেটের বুদবুদ যেকোনো সময় ফেটে গিয়ে শিল্পকে একটি বড় ধরনের আর্থিক মন্দার মুখে ফেলে দিতে পারে।
মন্তব্য