খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই নভেম্বর ২০২২, ৪:৫৫ এএম

মায়াবনবিহারিণী হরিণী গানটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক কালজয়ী ও নন্দনতাত্ত্বিক সৃষ্টি। এটি মূলত কবির বিখ্যাত নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’-র প্রথম দৃশ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গান। ১৯৩৯ সালে নৃত্যনাট্য হিসেবে ‘শ্যামা’ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করলেও, এর মূল গল্পটি গড়ে উঠেছিল কবির ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থের ‘পরিশোধ’ কবিতা অবলম্বনে। বিদ্যমান খসড়া টেক্সটে ২০১১ সালের কলকাতার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেডরুম’-এর উল্লেখ রয়েছে, যেখানে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরী আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংগীতে গানটি নতুন করে কভার করেছিলেন। চলচ্চিত্রে সোমলতার এই পরিবেশনাটি সমকালীন তরুণ প্রজন্মের শ্রোতাদের মাঝে রবীন্দ্রসংগীতের এক নতুন ধারাকে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে। একটি অধরা সৌন্দর্যকে দূর থেকে ভালোবাসার আকুতি এবং জোর করে তাকে পাওয়ার মোহ ত্যাগ করার এক দার্শনিক ও নান্দনিক প্রেক্ষাপট থেকে এই গানটি রচিত হয়েছে।
মায়াবনবিহারিণী হরিণী, গহন-স্বপন-সঞ্চারিণী,
কেন তারে ধরিবারে করি পণ অকারণ।
থাক্ থাক্ নিজমনে দূরেতে,
আমি শুধু বাঁশরির সুরেতে
পরশ করিব ওর প্রাণমন অকারণ।
চমকিবে ফাগুনেরও পবনে, পশিবে আকাশবাণী শ্রবণে
চিত্ত আকুল হবে অনুখন অকারণ।
দূর হতে আমি তারে সাধিব, গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব—
বাঁধন-বিহীন সেই যে বাঁধন অকারণ।
Mayabono biharini horini (Romanized Version):
Mayabono biharini horini, gohono-swopono-shoncharini,
Keno tare dhoribare kori pon okaron.
Thak thak nijo mone durete,
Ami shudu banshoriro shurete
Porosho koribo or pranomon okaron.
Chomokibe fagunero pobone, poshibe akashbani shrobone
Chitto akulo hobe anukhon okaron.
Dur hote ami tare sadhibo, gopone birohodore bandhibo—
Bandhono-bihino sei je bandhon okaron.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানটির সুরারোপ করেছেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত মধুর রাগ ‘ইমন-কল্যাণ’-এর ওপর ভিত্তি করে। গানটির মূল ছন্দ ও তাল হলো কাহারবা, যা এর লয় ও চলনকে বেশ চটুল ও গতিশীল করে তুলেছে। গানটির মূল ভাবার্থ হলো প্রেম ও সৌন্দর্যের এক পরম আধ্যাত্মিক ও লৌকিক দর্শন। এখানে হরিণী বা প্রেয়সী হলো এক মুক্ত চেতনা, যাকে খাঁটি ভালোবাসতে হলে তাকে বন্দি করার প্রয়োজন নেই। দূর থেকে কেবল বাঁশির সুরে এবং বিরহের বন্ধনে কীভাবে কোনো মানুষকে হৃদয়ের গহীন কোণে স্থায়ী আসন দেওয়া যায়, সেই অনন্য ও পবিত্র প্রেমচেতনাই এই গানের মূল উপজীব্য।
এই সৃষ্টির প্রধান বিশেষত্ব হলো কবির অসাধারণ শব্দচয়ন ও রূপকের ব্যবহার। ‘বাঁধন-বিহীন সেই যে বাঁধন’ বাক্যটির মাধ্যমে তিনি ভালোবাসার এক পরম সত্যকে প্রকাশ করেছেন, যা মানুষকে মুক্ত রেখেই জয় করতে শেখায়। মূল রবীন্দ্র ঘরানার বাইরে এসে সোমলতা আচার্য চৌধুরীর আধুনিক ড্রিম-পপ ও সফট-রক রিদমের সংগীতায়োজন এবং তাঁর মিষ্টি কণ্ঠের পরিবেশনা গানটিকে বর্তমান যুগের শ্রোতাদের কাছে একটি দুর্দান্ত ওয়েস্টার্ন-ফিউশন রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে অমর করে রেখেছে।
উৎস (Sources) :
এই আর্টিকেলের তথ্য ও লিরিকসমূহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অফিশিয়াল ‘গীতিবিতান’ ও ‘স্বরবিতান’ মূল গ্রন্থ, বিশ্বভারতী সংগীত প্রকাশনা পর্ষদ, বেডরুম চলচ্চিত্রের মূল সাউন্ডট্র্যাক ক্রেডিট নোট এবং সোমলতা আচার্য চৌধুরীর অফিশিয়াল ডিস্কোগ্রাফি আর্কাইভ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে সংকলিত করা হয়েছে।
মন্তব্য