খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২২, ১০:৪৫ এএম
‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ বাংলা লোকসংগীত এবং বাউল দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম একটি শীর্ষস্থানীয় কালজয়ী রচনা। গানটির মূল রচয়িতা ও সুরকার আধ্যাত্মিক সাধক, দার্শনিক ও বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীতে রচিত এই গানটি লালন সাঁইজির দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক ভাবনার এক অনন্য দলিল। যুগে যুগে বহু প্রখ্যাত শিল্পী গানটি পরিবেশন করলেও সমকালীন সময়ে শান্তিনিকেতনের জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ও লোকসংগীত শিল্পী সাহানা বাজপেয়ী (Sahana Bajpaie)-এর কণ্ঠে গানটি নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের মাঝে দারুণভাবে সমাদৃত হয়েছে। সংগীতশিল্পী সমন্তক সিনহা (Samantak Sinha)-এর চমৎকার আধুনিক ও অ্যাকোস্টিক সংগীতায়োজনে গানটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে, যা শ্রোতাকে এক শান্ত মরমী জগতের সন্ধান দেয়।
বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শী বসত করে,
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
গেরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে,
বাঞ্ছা করি দেখব তারে
আমি কেমনে সেথা যাই রে।
কী বলব সেই পড়শীর কথা
হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাই রে,
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।
পড়শী যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত দূরে,
সে আর লালন একখানে রয়
লক্ষ যোজন ফাঁক রে।
Barir kache arshinagar
Setha ek porshi bosot kore,
Ami ekdino na dekhilam taare.
Geram bere ogadh pani
Nai kinara nai toroni pare,
Bancha kori dekhbo tare
Ami kemne setha jai re.
Kee bolbo sei porshir kotha
Hosto podo skondho matha nai re,
Khonek thake shunner upor
Khonek bhasho neere.
Porshi jodi amay chuto
Jom jatona sokol jeto dure,
Se ar lalon ekkhane roy
Lokkho jojon phak re.
সুরের দিক থেকে গানটি মূলত খাঁটি বাংলার বাউল বা লোকসংগীতের সুরকাঠামোয় তৈরি। তবে সাহানা বাজপেয়ীর এই সংস্করণে সমন্তক সিনহার সংগীতায়োজন গানটিতে একটি বৈশ্বিক ওয়েস্টার্ন ফোক বা অল্টারনেটিভ ফোকের আবহ এনে দিয়েছে। গিটারের মেলোডিয়াস স্ট্রামিং এবং ডটোরার ঐতিহ্যবাহী টুংটাং শব্দের সাথে সাহানা বাজপেয়ীর চড়া অথচ মায়াবী কণ্ঠের গায়কি গানটিকে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর করে তুলেছে। কোনো চটকদার বা ভারী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করায় গানটির মূল বাউল ঘরানার আধ্যাত্মিক ভাব এবং বাণীর গুরুত্ব আধুনিক শ্রোতার কান ও মনকে সহজেই স্পর্শ করে।
গানটির মূল ভাবার্থ গভীর দেহতত্ত্ব এবং লালন দর্শনের আত্মানুসন্ধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে ‘আরশিনগর’ বা আয়নার শহর বলতে মূলত মানুষের নিজের দেহকেই বোঝানো হয়েছে এবং ‘পড়শী’ হলেন মানুষের ভেতরে বাস করা সেই পরমাত্মা বা মনের মানুষ। লালন শাহ এই চরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যে মানুষের পরম আরাধ্য সৃষ্টিকর্তা বা মনের মানুষ তার নিজের ভেতরেই বাস করে, অথচ মানুষ মোহের বশে তাকে বাইরে খুঁজে বেড়ায়। ‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানি’ এবং ‘হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাই’ প্রকাশের মাধ্যমে পরমাত্মার নিরাকার রূপ এবং জাগতিক মায়াজালের কারণে মানুষের সাথে তার ভেতরের সেই পরম সত্তার দূরত্বের কথা বলা হয়েছে। নিজের ভেতরে বাস করেও মানুষ যে অহংকার ও অজ্ঞতার কারণে নিজের আত্মাকে চিনতে পারে না, ‘লক্ষ যোজন ফাঁক’ রূপকটি দিয়ে সেই আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মন্তব্য