খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই নভেম্বর ২০২২, ১১:৪৪ এএম

আমি যারে বাসি ভালো গানটি বাঙালি মরমী ও বাউল সংগীতের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এই গানটির মূল রচয়িতা ও সুরকার হলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চারণ কবি ও বাউল সাধক কবিয়াল বিজয় সরকার, যাঁর আসল নাম বিজয় কৃষ্ণ অধিকারী। ভক্তদের কাছে তিনি ‘পাগল বিজয়’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি নিজের একটি কবিগানের দল গঠন করেন এবং তাঁর রচিত ধুয়া ও বিচ্ছেদী গানগুলো তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় তুমুল সাড়া জাগায়। বিদ্যমান খসড়া টেক্সটটিতে রাধারমণ দত্ত এবং শফিকুন্নুর নামক অন্য দুজন সাধকের গানের বাণী ভুলবশত এই গানের সাথে মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল, যা প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ সংশোধন করা হয়েছে। কবিয়াল বিজয় সরকার মানবপ্রেম ও ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের এক গভীর আকুলতা থেকে এই কালজয়ী বিচ্ছেদী গানটি রচনা করেন।
আমি যারে বাসি ভালো সে কি রে তা জানে
জানলে ব্যথা অমন করে দিত না আর প্রাণে।
এই জগতে ভালোবাসা আমার হলো না
ভালোবাসার বিনিময়ে মন কিছুই পেল না
আমি পরকে ভালোবেসে রে ভুল করিলাম জীবনে।
পরকে ভালোবেসে আমার কান্না হলো সার
আমার চোখে জল দেখে কেউ কাঁদে না ব্যথার
আমি যার কাছে যাই দেয় বেদনা ব্যথাভরা জীবনে।
বিজয় বলে ভালোবাসা হলো না আমার
সারাজনম ঘুরে মনের মানুষ পেলাম না
আমি পরকে ভালোবেসে রে ভুল করিলাম জীবনে।
Ami jare bashi valo se ki re ta jane
Janle byatha omon kore dito na ar prane.
Ei jogote bhalobasha amar holo na
Bhalobashar binimoye mon kichui pelo na
Ami porke bhalobese re bhul korilam jibone.
Porke bhalobese amar kanna holo shar
Amar chokhe jol dekhe keu kande na byathar
Ami jar kache jai dey bedona byathabhora jibone.
Bijoy bole bhalobasha holo na amar
Sarajonom ghure moner manush pelam na
Ami porke bhalobese re bhul korilam jibone.
সুরের ধরন: এই গানটির সুর মূলত খাঁটি লোকায়ত ভাটিয়ালী এবং বাউল বিচ্ছেদী সুরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কবিয়াল বিজয় সরকার তাঁর ধুয়া ও বিচ্ছেদী গানে ভাটিয়ালী সুরের যে অনন্য প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন, এই গানটি তার একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
গানের মূল ভাব: গানটির মূল ভাবার্থ হলো গভীর বিরহ, একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক আর্তি। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ পার্থিব প্রেম ও প্রিয়জনের কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার বেদনা মনে হলেও, বাউল দর্শনের গভীরে এটি মূলত ‘মনের মানুষ’ বা পরমেশ্বরের খোঁজ পাওয়ার এক আকুল আর্তি। জগতের মোহে পড়ে স্রষ্টাকে ভুলে থাকার অনুশোচনা এবং আধ্যাত্মিক অপূর্ণতার আর্তিই এখানে বিরহের সুরে প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষত্ব: গানটির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর সহজ-সরল অথচ হৃদয়স্পর্শী শব্দচয়ন, যা সরাসরি শ্রোতার অন্তরকে ছুঁয়ে যায়। বিজয় সরকারের গায়কীতে যে মরমী টান ছিল, তা এক গভীর বৈরাগ্যের আবহ তৈরি করে। ঐতিহ্যবাহী দোতারা, বাঁশি এবং মন্দিরের মৃদু সংগতে এই গানের সুর শ্রোতাকে জাগতিক দুঃখ-বেদনার ঊর্ধ্বে এক অপার্থিব অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়।
উৎস (Sources) :
এই আর্টিকেলের জীবনী ও লিরিক সংক্রান্ত তথ্যসমূহ কবিয়াল বিজয় সরকারের জীবন ও কর্মভিত্তিক প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী, বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীত আর্কাইভ এবং ওস্তাদ ও গবেষকদের দ্বারা সম্পাদিত বিজয় সরকারের প্রামাণ্য স্বরলিপি সংকলন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে সংকলিত করা হয়েছে।
বিজয় ‘সরকার বাংলাদেশের নড়াইলের ডুমদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম বিজয় কৃষ্ণ অধিকারী। কবি তার ভক্ত ও স্থানীয়দের কাছে ‘পাগল বিজয়’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। তার পিতার নাম নবকৃষ্ণ বৈরাগী ও মাতার নাম হিমালয়া কুমারী। পিতামহের নাম গোপালচন্দ্র বৈররাগী । তিনি স্থানীয় টাবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে নেপাল বিশ্বাস নামক একজন শিক্ষকের কাছে যাত্রাগানের উপযোগী নাচ, গান ও অভিনয় শেখেন।
১৯২৯ সালে বিজয় ‘সরকার নিজের একটি গানের দল করেন এবং কবিয়াল হিসেবে পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি গানের কথা এবং সুর করতেন। ভাটিয়ালী সুরের উপর ভিত্তি করে তার ধুয়া গানের জন্য তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান। তিনি রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ প্রমুখের সান্নিধ্যে আসেন।বিজয়’ সরকার প্রায় ৪০০ সখি সংবাদ এবং ধুয়া গান রচনা করেন।
তিনি ১৯৮৫ সালে ভারতের বেলুড়ে মৃতুবরণ করেন ।
মন্তব্য