খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই মার্চ ২০১৫, ১০:১৭ পিএম

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘ধ্রুপদ’ হলো সবচেয়ে প্রাচীন, সুসংহত এবং রাজকীয় গায়কীর রূপ। ‘ধ্রুপদ’ শব্দটি এসেছে ‘ধ্রুব’ এবং ‘পদ’—এই দুটি শব্দের মেলবন্ধন থেকে। ধ্রুব শব্দের অর্থ অটল বা চিরন্তন, আর পদ মানে কবিতা বা বাক্য। অর্থাৎ, যা সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ এবং তালের কঠোর নিয়মে বাঁধা, তা-ই ধ্রুপদ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহ তোমারের পৃষ্ঠপোষকতায় ধ্রুপদ তার চরম উৎকর্ষ লাভ করে। তিনি ধ্রুপদকে কেবল মন্দিরের দেব-আরাধনা থেকে বের করে রাজদরবারের প্রধান শৈল্পিক রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে মিয়া তানসেনের হাত ধরে ধ্রুপদ তার স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। এই গায়কীর মূল মেজাজ ছিল ভীষণ গম্ভীর, বীরত্বব্যঞ্জক এবং আধ্যাত্মিক ভাবপূর্ণ। ধ্রুপদ গাওয়ার আগে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়া কেবল ‘নম তোম’ শব্দাংশ দিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করা হতো, যা শ্রোতাকে এক ধ্যানমগ্ন পরিবেশে নিয়ে যেত। ধ্রুপদের চারটি প্রধান শৈলী বা ‘বাণী’ ছিল, যা বিভিন্ন ঘরানার পরিচয় বহন করত:
ধ্রুপদের মূল তাল ছিল চৌতাল, ধামার বা সুলতাল। পাখোয়াজের গম্ভীর আওয়াজের সাথে যখন ধ্রুপদ গাওয়া হতো, তখন তার ভেতর কোনো ধরণের চপলতা বা হালকা তান-কারুকার্যের অনুমতি ছিল না। এই কঠোর ব্যাকরণই একসময় ধ্রুপদের জন্য আশীর্বাদের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়।
‘খেয়াল’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ চিন্তা, কল্পনা বা স্বকীয় মনের ভাব। ধ্রুপদের কঠোর ও অনমনীয় শৃঙ্খলের বিপরীতে খেয়াল গায়কীর জন্ম হয়েছিল মূলত শিল্পীর কল্পনাশক্তিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। ঐতিহাসিকভাবে মনে করা হয়, ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে সুফি সাধক ও কবি হযরত আমীর খসরু ধ্রুপদের গম্ভীর কাঠামোর সাথে পারসিক কাওয়ালি ও লোকসুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে খেয়ালের একটি প্রাথমিক রূপ তৈরি করেছিলেন। তবে সেই সময়ে খেয়ালকে ধ্রুপদের চেয়ে কিছুটা ‘হালকা’ বা চপল প্রকৃতির গান মনে করা হতো, ফলে রাজদরবারে এটি তখনো মূল গায়কীর মর্যাদা পায়নি।
খেয়াল গায়কীর প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং স্বর্ণযুগ আসে অষ্টাদশ শতাব্দীতে, মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ রঙ্গীলার (১৭১৯–১৭৪৮) শাসনকালে। তাঁর দরবারে নেয়ামত খান (যিনি ‘সদারঙ্গ’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন) এবং তাঁর ভাইপো ফিরোজ খান (যিনি ‘অদারঙ্গ’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন) নামে দুজন অসাধারণ ধ্রুপদী ও বংশীবাদক ছিলেন। তাঁরা দেখলেন যে ধ্রুপদের কঠোর মেজাজ সাধারণ শ্রোতা বা তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু রাজকীয় সমাজের মনকে পুরোপুরি ছুঁতে পারছে না।
সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ নিজেরা ধ্রুপদী হওয়া সত্ত্বেও নেপথ্যে বসে শত শত খেয়ালের ‘বন্দিশ’ বা গান রচনা করলেন। তাঁরা তাঁদের ছাত্রদের মাধ্যমে এই নতুন গায়কী দরবারে পরিবেশন করালেন। তাঁদের রচিত বন্দিশগুলো এতটাই চমৎকার, শ্রুতিমধুর এবং কারুকার্যময় ছিল যে সম্রাট মোহাম্মদ শাহ মুগ্ধ হয়ে যান। দেখতে দেখতে দিল্লীর দরবার থেকে ধ্রুপদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিলুপ্ত হয় এবং খেয়াল হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রধান এবং সবচেয়ে সম্মানিত গায়কী হিসেবে নিজের স্থান দখল করে।
ধ্রুপদ থেকে খেয়ালের এই রূপান্তর আসলে ছিল এক ধরণের শৈল্পিক মুক্তি। ধ্রুপদে বাণী বা শব্দের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কিন্তু খেয়ালে এসে শব্দের চেয়ে ‘সুরের বিস্তার’ প্রধান হয়ে উঠল। খেয়াল গায়কীতে শিল্পীকে এক বিশাল স্বাধীন ক্যানভাস দেওয়া হলো, যেখানে তিনি নিজের মতো করে সুরের রঙ ছড়াতে পারেন।
ধ্রুপদের কঠোর তালের বাঁধন ভেঙে খেয়ালে এল কিছু অনন্য বৈচিত্র্য:
তান এবং বোলতান: খেয়ালের প্রধান আকর্ষণ হলো এর দ্রুত গতির ‘তান’ (দ্রুত লয়ে স্বরের বিন্যাস)। ধ্রুপদে তানের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। খেয়ালে শিল্পীরা আকার দিয়ে বা গানের শব্দ ব্যবহার করে (বোলতান) বিদ্যুৎ গতিতে স্বর মণ্ডলে বিচরণ করার স্বাধীনতা পেলেন।
বাটের কারুকার্য: লয় বা ছন্দের সাথে খেলা করার যে স্বাধীনতা খেয়ালে পাওয়া যায়, তা ধ্রুপদের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়।
রোমান্টিক ও মানবিক ভাব: ধ্রুপদের বিষয়বস্তু ছিল মূলত ঈশ্বর বন্দনা বা রাজার প্রশংসা। কিন্তু খেয়ালের বন্দিশে উঠে এল রাধাকৃষ্ণের প্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য, বসন্তের আগমন, বিরহ এবং দৈনন্দিন জীবনের মানবিক অনুভূতি। এই রোমান্টিক ভাবের মেলবন্ধন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অনেক কাছাকাছি নিয়ে এল।
খেয়াল গায়কী তার পূর্ণতা পায় দুটি প্রধান ভাগের মাধ্যমে—‘বড় খেয়াল’ (বিলম্বিত খেয়াল) এবং ‘ছোট খেয়াল’ (দ্রুত খেয়াল)। এই দুইয়ের সমন্বয়ই আজকের আধুনিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উৎসব বা কনসার্ট সংস্কৃতির মূল কাঠামো তৈরি করেছে।
১. বড় খেয়াল (বিলম্বিত লয়): এটি সাধারণত একতাল, তিলওয়ারা বা ঝুমরা তালের অত্যন্ত ধীর লয়ে গাওয়া হয়। এখানে গায়কীর মূল উদ্দেশ্য থাকে রাগের প্রতিটি স্বরকে ধীরে ধীরে উন্মোচন করা। আলাপ, বিস্তার এবং মীড়ের (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে আলতো করে যাওয়া) মাধ্যমে রাগের গভীর মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করা হয় এই অংশে। এটি অত্যন্ত ধৈর্য এবং গভীর সাধনার পরিচয় দেয়।
২. ছোট খেয়াল (দ্রুত লয়): বড় খেয়ালের গম্ভীর ও শান্ত পরিবেশ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় ছোট খেয়াল। এটি সাধারণত তিনতাল, ঝাপতাল বা দ্রুত একতালে গাওয়া হয়। এর গতি থাকে চটুল ও চঞ্চল। এখানে শিল্পীরা তাঁদের কণ্ঠের চাতুর্য, বিদ্যুৎ গতির তান, সরগম এবং তিহাইয়ের (একই স্বরগুচ্ছ তিনবার গেয়ে সমে আসা) মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে এক টানটান উত্তেজনা ও আনন্দের সৃষ্টি করেন।
উপসংহার: ধ্রুপদ ছিল এক শান্ত, অটল সুউচ্চ পর্বতের মতো, যা তার জায়গায় গম্ভীর। কিন্তু খেয়াল হলো পাহাড়ি নদীর মতো, যা তার আপন গতিতে স্বাধীন, চঞ্চল এবং নান্দনিক। সময়ের প্রয়োজনে ধ্রুপদের কঠোরতা যখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন খেয়াল গায়কী এসে ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতকে এক নতুন জীবন ও দীর্ঘায়ু দান করে। আজ বিশ্বজুড়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে জয়জয়কার, তার সিংহভাগ অবদান এই খেয়াল গায়কীরই।
মন্তব্য