খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই মার্চ ২০১৫, ১১:৬ পিএম

ভারতীয় উপমহাদেশে যে দুটি প্রধান শাস্ত্রীয় বা উচ্চাঙ্গসংগীতের ধারা হাজার বছর ধরে সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়েছে, তার একটি হলো দক্ষিণ ভারতীয় বা ‘কর্ণাটকী সংগীত’ এবং অন্যটি উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ‘হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত’। হিন্দুস্থানী সংগীত কেবল কিছু রাগের সমষ্টি বা বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মূলত সুরের পরিমণ্ডলে ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক পরম মেলবন্ধন। এর উৎস যেমন বৈদিক যুগের সামবেদের পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণে, তেমনি এর বিকাশ ও পূর্ণতা ঘটেছে সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক মারফতি গান এবং মুঘল দরবারের রাজকীয় আভিজাত্যে। যুগ যুগ ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি বা মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে টিকে থাকা এই সংগীত ধারা মানুষকে পার্থিব জগতের কোলাহল থেকে মুক্ত করে এক পরম আধ্যাত্মিক শান্তিতে নিমজ্জিত করে।
হিন্দুস্থানী সংগীতের আজকের এই যে রূপ, তা মূলত এক সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফসল। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্বে সমগ্র ভারতের উচ্চাঙ্গসংগীত মূলত একটি সাধারণ ধারাতেই প্রবাহিত হতো, যার প্রধান ভিত্তি ছিল ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’। তবে উত্তর ভারতে একের পর এক মুসলিম শাসক ও সুলতানদের আগমনের ফলে এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে উত্তর ভারতের সংগীত পারস্য (Persian), আরব ও মধ্য এশিয়ার সংগীত শৈলীর সংস্পর্শে আসে, যা জন্ম দেয় আজকের ‘হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত’-এর।
এই বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী নাম হযরত আমীর খসরু। তিনি ভারতীয় সংগীতের প্রাচীন গম্ভীর রূপকে অক্ষুণ্ণ রেখে তার সাথে পারসিক সুর ও ছন্দের এমন এক অপূর্ব নমনীয়তা যোগ করলেন, যা এই সংগীতকে মন্দির ও তপোবনের গণ্ডি থেকে বের করে রাজদরবারের প্রধান আকর্ষণে পরিণত করল। পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে মিয়া তানসেনের হাত ধরে হিন্দুস্থানী সংগীত তার রাজকীয় স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। তানসেন প্রাচীন রাগগুলোর সংস্কার করেন এবং নিজের সাধনা দিয়ে তৈরি করেন ‘মিয়া কি তোড়ি’ বা ‘দরবারী কানাড়া’র মতো কালজয়ী সব রাগ। এই রাজকীয় ও সুফি ঘরানার মেলবন্ধনেই হিন্দুস্থানী সংগীত লাভ করেছে তার চিরন্তন কারুকার্যময় রূপ।
হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যাকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল স্তম্ভগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
হিন্দুস্থানী সংগীতে যুগের সাথে সাথে প্রকাশের ধরনে নানা বৈচিত্র্য এসেছে, যা এই ধারাকে সমৃদ্ধ ও দীর্ঘায়ু করেছে:
১. ধ্রুপদ: এটি হিন্দুস্থানী সংগীতের সবচেয়ে প্রাচীন ও গম্ভীর রূপ। এতে কোনো চপলতা বা হালকা তানের স্থান নেই। চার বাণীতে বিভক্ত ধ্রুপদ মূলত বীরত্ব ও ভক্তির রসে ভরপুর, যা পাখোয়াজের তালের সাথে গাওয়া হয়।
২. খেয়াল: বর্তমান হিন্দুস্থানী সংগীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রধান ধারা। ‘খেয়াল’ শব্দের অর্থ কল্পনা। ধ্রুপদের কঠোর শৃঙ্খল ভেঙে শিল্পীর কল্পনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেই এর জন্ম। বিলম্বিত ও দ্রুত লয়ের মাধ্যমে খেয়াল গায়কী আধুনিক কনসার্ট সংস্কৃতির মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে।
৩. ঠুমরি ও দাদরা: এগুলোকে বলা হয় লঘু-শাস্ত্রীয় (Semi-classical) সংগীত। রাধাকৃষ্ণের প্রেম, বিরহ এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত নমনীয় ও রোমান্টিক ঢঙে ঠুমরি পরিবেশন করা হয়, যেখানে শব্দের চেয়ে ভাবের প্রকাশ প্রধান।
৪. তারানা ও তিলানা: অর্থহীন কিছু সুনির্দিষ্ট বোলের (যেমন: দেরে না, তানোম) দ্রুত গতির ছন্দময় বিন্যাসই হলো তারানা, যা কণ্ঠের চাতুর্য ও লয়ের খেলা ফুটিয়ে তোলে।
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর দিল্লির দরবার থেকে গুণী শিল্পীরা ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্য ও জমিদারদের আশ্রয়ে ছড়িয়ে পড়েন। এই বিকেন্দ্রীকরণ থেকেই জন্ম নেয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ঘরানা সংস্কৃতি’। ঘরানা হলো মূলত কোনো সুনির্দিষ্ট গুরু-শিষ্য পরম্পরা বা গায়কীর নিজস্ব ধারা।
যেমন, খেয়াল গায়কীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সরল রূপ ধরে রেখেছে গোয়ালিয়র ঘরানা। আবার ধ্রুপদের গাম্ভীর্য ও খেয়ালের কারুকার্যের মেলবন্ধন ঘটেছে আগ্রা ঘরানায়। বক্র তান ও জটিল স্বরসঙ্গতির জন্য বিখ্যাত ওস্তাদ আল্লদিয়া খাঁর জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা, আর লয় ও আবেগের পরম প্রকাশ দেখা যায় কিরানা ঘরানায়। এই ঘরানাগুলোর কারণেই হিন্দুস্থানী সংগীত কোনো এক জায়গায় স্থবির হয়ে না থেকে ভারতের কোণায় কোণায় নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে বিকশিত হতে পেরেছে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত ভারতের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, ওস্তাদ আল্লারাখা এবং ওস্তাদ জাকির হোসেনের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা বিশ্বমঞ্চে হিন্দুস্থানী সুর ও ছন্দের জাদুকে তুলে ধরেন। ওয়েস্টার্ন মিউজিকের সাথে এর মেলবন্ধনে জন্ম নেয় ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’।
আজকের ডিজিটাল ও আধুনিক ফিউশনের যুগেও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত তার মূল আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় চেতনাকে হারায়নি। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় ‘রাগ ভৈরব’-এর মরমী আবেদন কিংবা মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় ‘রাগ দরবারী’-এর রাজকীয় ও গম্ভীর পরিবেশনা আজও শ্রোতার মনে এক পরম প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। হাজার বছরের এই সুরের উত্তরাধিকার ভারতীয় উপমহাদেশের এক অমূল্য সম্পদ, যা মানব আত্মার চিরন্তন সৌন্দর্যেরই এক সুরময় বহিঃপ্রকাশ।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
৩. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. উত্তর ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস – প্রজ্ঞানন্দ স্বামী।
মন্তব্য