খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০১৫, ১০:২৮ পিএম

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল আকাশে কণ্ঠসংগীতকে যদি রাজা ভাবা হয়, তবে বাদ্যযন্ত্র হলো তার সুযোগ্য সারথি। তবে এই সারথির আজকের এই স্বাধীন ও রাজকীয় রূপ কিন্তু রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বিবর্তন, নিরীক্ষা এবং সাধনার এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। প্রাচীন বা মধ্যযুগে বাদ্যযন্ত্রের মূল ভূমিকা ছিল কেবল কণ্ঠশিল্পীকে সঙ্গ দেওয়া বা গানের লয়-তালকে ধরে রাখা। এককভাবে একটি বাদ্যযন্ত্র যে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে, তা একসময় ভাবাই যেত না। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো কেবল কণ্ঠের অনুকরণ করা ছেড়ে নিজেদের স্বতন্ত্র গায়কী ও বাদনশৈলী (যাকে আমরা ‘বাজ’ বলি) তৈরি করেছে। তপোবনের শান্ত পরিবেশ থেকে শুরু করে রাজদরবারের একক মেহফিল, আর সেখান থেকে আজকের আধুনিক আন্তর্জাতিক কনসার্ট হলের রাজকীয় মঞ্চ—সহযোগী থেকে একক পারফর্মার হিসেবে বাদ্যযন্ত্রের এই উত্তরণের গল্পটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যেকোনো আসরের দিকে তাকালে সবার আগে যে বাদ্যযন্ত্রটির মৃদু অথচ গম্ভীর ঝঙ্কার আমাদের কানে আসে, তা হলো ‘তানপুরা’ বা ‘তম্বুরা’। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি একটি অত্যন্ত সহজ যন্ত্র, যাতে মাত্র চারটি (কদাচিৎ পাঁচটি বা ছয়টি) তার থাকে এবং এতে কোনো পর্দা বা ফ্রেইট থাকে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তানপুরা হলো ভারতীয় সঙ্গীতের মেরুদণ্ড এবং এর আধ্যাত্মিক ধ্রুবতারা।
তানপুরার ইতিহাস প্রাচীন ভারতীয় ‘বীণা’ পরিবারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। প্রাচীনকালে যেকোনো তারের যন্ত্রকেই ‘বীণা’ বলা হতো (যেমন—একতন্ত্রী বীণা, বিপঞ্চী বীণা ইত্যাদি)। ধারণা করা হয়, তূণব বা প্রাচীন একতন্ত্রী বীণার আধুনিক ও পরিমার্জিত রূপই হলো আজকের তানপুরা। এর নামের পেছনে ‘তম্বুরু’ নামক এক গন্ধর্বের (স্বর্গীয় সঙ্গীতশিল্পী) নাম জড়িয়ে আছে বলে লোকশ্রুতি রয়েছে। আবার অনেকের মতে, লাউ বা কাঠের তৈরি এর নিচের গোল অংশটিকে ‘তুয়ঁ’ বা ‘তুম্বা’ বলা হয় বলেই এর নাম তম্বুরা বা তানপুরা হয়েছে। মধ্যযুগে যখন রাগ-সংগীতের ব্যাকরণ সুনির্দিষ্ট হতে শুরু করে, তখন গায়কের কণ্ঠকে একটি নির্দিষ্ট স্বরস্থানে (Pitch) স্থির রাখার জন্য এবং রাগের মূল আবহ তৈরি করার জন্য এই ড্রোন (Drone) বা ভিত্তি-স্বরের যন্ত্রটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
তানপুরা কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতীক। এর চারটি তার সাধারণত ‘পা-সা-সা-সা’ বা ‘মা-সা-সা-সা’ (পঞ্চম, ষড়জ, ষড়জ এবং উদারা সপ্তকের ষড়জ) নিয়মে বাঁধা হয়। যখন এই তারগুলোতে আলতো করে আঙুল ছোঁয়ানো হয়, তখন অ্যাকোস্টিক বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত জাদু তৈরি হয়। একে বলা হয় ‘সোয়ার্ম’ (Swarm) বা ওভারটোন (Overtones)। মূল চারটি স্বর বাজানো হলেও তার সূক্ষ্ম কম্পন থেকে বাতাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিখুঁত গন্ধার (গা) এবং নিষাদ (নি)-এর মতো স্বয়ম্ভু স্বরধ্বনি তৈরি হয়, যা পুরো পরিবেশকে এক ঐশ্বরিক শান্তিতে ভরিয়ে দেয়।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে মনে করা হয়, তানপুরার এই অবিরাম ঝঙ্কার আসলে মহাবিশ্বের আদি নাদ বা ‘ওঁকার’ ধ্বনির প্রতীক। একজন সাধক যখন তানপুরার সুরে নিজের কণ্ঠকে মেলান, তখন তিনি মূলত নিজের অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে সুরের অনন্ত সমুদ্রে বিলীন হয়ে যান। এই কারণেই ধ্রুপদ, খেয়াল কিংবা যেকোনো যন্ত্রসঙ্গীতের আসরে তানপুরা ছাড়া সুরের আরাধনা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

তারের বাদ্যযন্ত্র বা তত যন্ত্রের মধ্যে বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা এবং রাজকীয় মর্যাদা পেয়েছে ‘সেতার’। তবে আজকের এই বহু-তার বিশিষ্ট, জটিল কারুকার্যময় সেতারটি মধ্যযুগে দেখতে এমন ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত সরল একটি যন্ত্র।
সেতারের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় মতটি সুফি সাধক, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ হযরত আমীর খসরুর (১২৫৩–১৩২৫) সাথে যুক্ত। পারস্যে ‘সেহতার’ (Sehtar) নামে একটি তারের যন্ত্র প্রচলিত ছিল। ফারসি ভাষায় ‘সে’ শব্দের অর্থ তিন এবং ‘তার’ মানে সুতো বা তার। অর্থাৎ, তিন তারের যন্ত্রই হলো সেহতার। আমীর খসরু ভারতে প্রচলিত প্রাচীন ‘ত্রিতন্ত্রী বীণা’ এবং এই পারসিক ‘সেহতার’-এর মধ্যে এক চমৎকার সমন্বয় ঘটান। তিনি এর গঠনশৈলীতে পরিবর্তন এনে তারের সংখ্যা এবং বিন্যাস এমনভাবে সাজালেন, যা ভারতীয় রাগের বক্র চলন এবং মীড় (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে আলতো করে ঘষে যাওয়া) প্রকাশের উপযোগী হয়। কালক্রমে এই ‘সেহতার’ শব্দটিরই লোকমুখে অপভ্রংশ হয়ে নাম হয় ‘সেতার’।
আমীর খসরুর পর সেতারের সবচেয়ে বড় গাঠনিক ও শৈল্পিক রূপান্তর ঘটে মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধান দরবারী সঙ্গীতশিল্পী মিয়া তানসেনের বংশধরদের হাত ধরে, যাঁরা ‘সেনিয়া ঘরানা’ নামে পরিচিত। ওস্তাদ মসীদ খান (অষ্টাদশ শতাব্দী) সেতারে এক নতুন বাজ বা বাদনশৈলীর প্রবর্তন করেন, যা তাঁর নামানুসারে ‘মসীদখানি গত’ (বিলম্বিত বা ধীর লয়ের বাজ) নামে পরিচিত হয়। তাঁর এই আবিষ্কার সেতারকে কণ্ঠসংগীতের খেয়াল গায়কীর মতো গম্ভীর ও ধীর বিস্তারের উপযোগী করে তোলে। পরবর্তীতে ওস্তাদ রাজা খান তৈরি করেন ‘রাজাখানি গত’ (দ্রুত লয়ের চটুল বাজ), যা সেতারে দ্রুত তান ও ঝালার কাজের পথ খুলে দেয়।
উনিশ শতকে ওস্তাদ আমদাদ খান এবং তাঁর পুত্র ওস্তাদ এনায়েত খান সেতারের নিচের তুম্বার সাথে ওপরের ডাণ্ডায় আরেকটি ছোট তুম্বা যুক্ত করেন এবং তারের সংখ্যা বাড়িয়ে এতে ‘তরফ’-এর তার (সহায়ক কম্পনশীল তার) যুক্ত করেন। এর ফলে সেতারের ধ্বনি আরও গম্ভীর, প্রতিধ্বনিত এবং মিষ্টি হয়ে ওঠে। কণ্ঠসংগীতের তান, গমক, জামজামা এবং ধ্রুপদ অঙ্গের মীন-আলাপকে সেতারের পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার এই অবিরাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জন্ম নেয় আমাদের আজকের আধুনিক সেতার।

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালবাদ্য বা অবনদ্ধ যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র হলো ‘তবলা-বাঁয়া’ বা সংক্ষেপে তবলা। তবলার গম্ভীর নাদ এবং দ্রুত লয়ের চটুল বোল ছাড়া আজকের খেয়াল, ঠুমরি বা সেতারের আসর কল্পনাই করা যায় না। তবে এই যুগল বাদ্যযন্ত্রটির ইতিহাস ও উৎপত্তি নিয়ে সঙ্গীত গবেষকদের মধ্যে চমৎকার সব কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে।
তবলার উৎপত্তি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত এবং রোমাঞ্চকর লোকশ্রুতিটি সুফি সাধক আমীর খসরুর সাথে যুক্ত। প্রচলিত আছে, দিল্লির সুলতানি আমলে তৎকালীন দরবারের প্রধান পাখোয়াজ (মৃদঙ্গ জাতীয় এক খণ্ডের গম্ভীর বাদ্যযন্ত্র) বাদক ওস্তাদ কুদউ সিং-এর সাথে এক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন আমীর খসরু। একপর্যায়ে ছন্দের এক চরম মুহূর্তে ওস্তাদ কুদউ সিং-এর পাখোয়াজটি মাঝখান থেকে ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। আমীর খসরু তখন সেই ভাঙা পাখোয়াজের ডান পাশের অংশটিকে খাড়া করে এবং বাঁ পাশের অংশটিকে কিছুটা গোল আকার দিয়ে বাজাতে শুরু করেন এবং ফারসি ভাষায় বলেন, “তব ভি বোলা” (তারপরেও বাজল)। এই ‘তব ভি’ শব্দ থেকেই নাকি ‘তবলা’ নামের উৎপত্তি।
তবে ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, আরবি শব্দ ‘ত্ববল’ (যার অর্থ যেকোনো ধরণের ঢাক বা ড্রাম) থেকে তবলা শব্দটি এসেছে। প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য ও মন্দিরের দেয়ালে (যেমন ভাজা গুহা বা কোনারকের সূর্য মন্দির) দুই খণ্ডের খাড়া ড্রাম বাজানোরত মূর্তির চিত্র খোদাই করা আছে, যা প্রমাণ করে যে তবলার একটি আদিম ভারতীয় রূপ প্রাচীনকালেই বিদ্যমান ছিল। মধ্যযুগে যখন খেয়াল ও ঠুমরি গায়কীর মতো নমনীয় ও দ্রুত গতির গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন পাখোয়াজের অতি গম্ভীর ও ভারী আওয়াজ সেই চটুল সুরের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে পাখোয়াজের ডান দিকটিকে কাঠের তৈরি ‘ডাইনা’ বা তবলা এবং বাঁ দিকটিকে মাটি বা ধাতুর তৈরি ‘বাঁয়া’ বা ডুগিতে রূপান্তর করা হয়।
তবলা যখন একটি স্বাধীন বাদ্যযন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল, তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক ও শৈল্পিক আবহাওয়াকে কেন্দ্র করে এর প্রধান ৬টি ঘরানার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ঘরানার বাজ বা বোলের নিজস্ব ব্যাকরণ ও মেজাজ রয়েছে:
দিল্লি ঘরানা: এটিকে তবলার আদি বা সবচেয়ে প্রাচীন ঘরানা বলা হয়। ওস্তাদ সিধার খান ধাড়ি এই ঘরানার প্রবর্তক। দিল্লির বাজের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি মূলত ‘আঙুলের বাজ’। এখানে হাতের তালুর চেয়ে তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের ডগা দিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিষ্কার বোল (যেমন: ধিন, খিন, তি তা) বাজানো হয়।
লখনউ ঘরানা: নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর দরবারে কত্থক নৃত্য এবং ঠুমরি গানের সাথে সংগত করতে গিয়ে এই ঘরানার জন্ম। ওস্তাদ মিয়ান মোদু খান এই ধারার বিকাশ ঘটান। লখনউ বাজের বৈশিষ্ট্য হলো এতে হাতের পুরো থাপ্পড় বা তালুর ব্যবহার বেশি হয় এবং এর বোলগুলো (যেমন: ধেরেধেরে, তাকিত) অনেক বেশি গমকপূর্ণ ও চটুল, যা নাচের ভঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলে।
ফররুখাবাদ ঘরানা: লখনউ ঘরানার শিষ্য ওস্তাদ হাজী বিলায়ত আলী খান এই ঘরানা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত দিল্লি ও লখনউ বাজের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যেখানে গৎ ও কায়েদার চমৎকার বিস্তার দেখা যায়।
বেনারস ঘরানা: পন্ডিত রাম সহায় লখনউতে শিক্ষা গ্রহণ করে বেনারসে এসে এই ঘরানা তৈরি করেন। আধ্যাত্মিক নগরী বেনারসের আবহাওয়া অনুযায়ী এই বাজের বোলগুলো বেশ জোরদার এবং স্পষ্ট। এখানে একক তবলা বাদন বা সোলো পারফরম্যান্সের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়।
পাঞ্জাব ঘরানা: এই ঘরানার বাজ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কারণ এর ওপর পাখোয়াজের বাজের গভীর প্রভাব রয়েছে। ওস্তাদ ফকির বখশ এই ধারার মূল পুরুষ। পাঞ্জাব ঘরানার জটিল ছন্দ, গাণিতিক হিসাব এবং লয়ের বৈচিত্র্য তবলা জগতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।

উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্তও বাদ্যযন্ত্রের অবস্থান ছিল মূলত ব্যাকস্টেজে বা কণ্ঠসংগীতের ছায়া হয়ে। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে। বাদ্যযন্ত্রগুলো কণ্ঠের অনুকরণ ছেড়ে নিজস্ব ‘তন্ত্রকারী অঙ্গ’ (বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব টেকনিক) ও ‘গায়কী অঙ্গ’ (কণ্ঠের মতো সুরের টান)-এর এমন এক মেলবন্ধন তৈরি করল, যা একক যন্ত্রসঙ্গীতকে এক অনন্য রাজকীয় আসনে বসিয়ে দিল। আর এই বিপ্লবের কাণ্ডারি ছিলেন কয়েকজন দূরদর্শী ভারতীয় কিংবদন্তি।
বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর (মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা) দুই সুযোগ্য শিষ্য—সরোদ সম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং সেতার মায়েস্ত্রো পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারতীয় যন্ত্রসঙ্গীতের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেন। ওস্তাদ আলী আকবর খান তাঁর সরোদের গম্ভীর, মরমী এবং বুক কাঁপানো সুর দিয়ে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়েছিলেন যে শব্দ ছাড়াই কীভাবে আত্মার গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। ১৯৫৫ সালে প্রখ্যাত ভায়োলিন বাদক ইহুদি মেনুহিনের আমন্ত্রণে তিনি প্রথম ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশনে একক পারফর্ম করেন এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সুরের খাতা খোলেন।
অন্যদিকে, পণ্ডিত রবিশঙ্কর ছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের এক অনন্য সাংস্কৃতিক দূত। তিনি সেতার বাদনকে কেবল নিখুঁত ব্যাকরণে বেঁধে রাখেননি, বরং তার উপস্থাপনায় এনেছিলেন এক আধুনিক ও নান্দনিক বৈশ্বিক রূপ। ১৯৬০-এর দশকে পাশ্চাত্যের যুবসমাজ যখন এক ধরণের মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর সেতারের আধ্যাত্মিক সুর নিয়ে তাঁদের সামনে হাজির হন। বিখ্যাত ব্রিটিশ পপ ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’-এর জর্জ হ্যারিসন রবিশঙ্করের শিষত্ব গ্রহণ করলে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় সেতারের এক অভূতপূর্ব ক্রেজ বা উন্মাদনা তৈরি হয়। ১৯৬৭ সালের ‘মনটেরি পপ ফেস্টিভ্যাল’ কিংবা ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ‘উডস্টক ফেস্টিভ্যাল’-এ হাজার হাজার পশ্চিমা শ্রোতার সামনে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারের ঝঙ্কার ভারতীয় যন্ত্রসঙ্গীতকে বিশ্বজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয়।
সেতার ও সরোদের এই বিশ্বজয়ের যাত্রায় ছন্দের জাদুকর হিসেবে যুক্ত হন পাঞ্জাব ঘরানার ওস্তাদ আল্লারাখা এবং পরবর্তীতে তাঁরই সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ জাকির হোসেন। জাকির হোসেন তবলাকে কেবল সংগত করার বাদ্যযন্ত্র থেকে উন্নীত করে আন্তর্জাতিক স্তরের এক প্রধান আকর্ষণীয় বাদ্যযন্ত্রে রূপান্তরিত করেন।
তিনি আমেরিকান ড্রামার জন ম্যাকলাফলিনের সাথে মিলে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ফিউশন ব্যান্ড ‘শাক্তি’ (Shakti)। এই ব্যান্ডের মাধ্যমে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জটিল তাল ও ছন্দের সাথে ওয়েস্টার্ন জ্যাজ (Jazz) এবং ব্লুজ মিউজিকের এক ঐতিহাসিক ফিউশন ঘটে। ওস্তাদ জাকির হোসেনের বিদ্যুৎ গতির আঙুলের কাজ, মুখে তবলার বোল আওড়ানোর অনবদ্য স্টাইল এবং হাস্যোজ্জ্বল পারফরম্যান্স বিশ্বমঞ্চে তবলাকে এক গ্ল্যামারাস রূপ দেয়, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যামি পুরস্কারে (Grammy Awards) ভূষিত হন।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতীয় শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রের এই দীর্ঘ যাত্রাপথের দিকে তাকালে এক পরম বিস্ময় জাগে। তানপুরার সেই আদিম ও শান্ত একতন্ত্রী নাদ থেকে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ সেতারের দ্রুত ঝালা আর তবলার তিহাইয়ের ঝংকারে এসে বিশ্বমঞ্চ মাতোয়ার করছে। সহযোগী হিসেবে যে বাদ্যযন্ত্রগুলোর জন্ম হয়েছিল, আজ তারা নিজেদের সাধনা, বিজ্ঞানসম্মত বিবর্তন এবং ওস্তাদদের মেধার জোরে বিশ্ব সঙ্গীতের দরবারে সবচেয়ে রাজকীয় এবং সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত। এই বিবর্তন কেবল বাদ্যযন্ত্রের রূপান্তর নয়, এটি মূলত ভারতীয় সংস্কৃতির উদারতা ও সুরের বৈশ্বিক বিজয়ের এক অমর মহাকাব্য।
মন্তব্য