খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই মার্চ ২০১৫, ৩:৩০ পিএম

রাগ ভৈরব হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম প্রাচীন এবং মৌলিক রাগ। এটি এক গম্ভীর ও ভক্তিপূর্ণ মেজাজের রাগ যা ভোরবেলায় পরিবেশিত হয়। এর চলন অত্যন্ত ধীর ও মন্থর, বিশেষত মন্দ্র সপ্তকে। ভৈরব রাগ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং প্রাচীনত্বের কারণে সংগীত জগতে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর স্বরবিন্যাস এবং পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এক শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা শ্রোতার মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।
ভৈরব রাগ তার নিজস্ব ‘ভৈরব ঠাট’ এর জন্মদাতা, যা এটিকে অন্যান্য রাগের মধ্যে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি প্রদান করেছে। এটি একটি জনন রাগ বা মূল রাগ, যার থেকে অন্যান্য অনেক রাগের উদ্ভব হয়েছে। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সুপ্রাচীন, মধ্যযুগের বিভিন্ন সংগীত গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এটি বহু কিংবদন্তীর সাথে যুক্ত। এর সরল কিন্তু গভীর কাঠামো এটিকে বিশুদ্ধ রূপ দান করেছে এবং এর মধ্যে অন্য কোনো রাগের মিশ্রণ বা অঙ্গের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়, যা এর মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
রাগ ভৈরবের প্রধান বিশেষত্ব হলো কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা) স্বরের ব্যবহার, যা একে এক স্বতন্ত্র মহিমা প্রদান করে। শুদ্ধ মধ্যম (মা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি) এর সাথে এই কোমল স্বরগুলি মিলে এক আকর্ষণীয় স্বরসঙ্গতি তৈরি করে। আরোহের চলনে সাধারণত ‘সা, কোমল রে, গা, মা, পা, কোমল ধা, নি, সা’ এই ক্রম অনুসরণ করা হয়। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বরসঙ্গতি হলো ধা থেকে রে পর্যন্ত মীড়, যা রাগের গভীরতা প্রকাশ করে। কোমল রে স্বরের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় এবং এর স্থায়ীত্ব রাগের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঠাট: ভৈরব
জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ
আরোহ: সা, কোমল রে, গা, মা, পা, কোমল ধা, নি, সা (উচ্চ)
অবরোহ: সা (উচ্চ), নি, কোমল ধা, পা, মা, গা, কোমল রে, সা
বাদী স্বর: কোমল ধা
সমবাদী স্বর: কোমল রে
বর্জিত স্বর: নেই
ব্যবহৃত স্বর: কোমল রে, কোমল ধা এবং শুদ্ধ সা, গা, মা, পা, নি।
সময়: দিনের প্রথম প্রহর (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)
প্রকৃতি: শান্ত, গম্ভীর, ভক্তিপূর্ণ, করুণ
কালাঙ্গিনী ভৈরব: এই রাগে মাঝে মাঝে শুদ্ধ ঋষভের ব্যবহার দেখা যায়, যা ভৈরব থেকে এর পার্থক্য তৈরি করে। ভৈরবের গভীর গাম্ভীর্যের চেয়ে কালাঙ্গিনী ভৈরবে কিছুটা মিষ্টি মন্দ্রতা অনুভূত হয়।
রামকলি: রামকলিও ভৈরব ঠাটের রাগ, কিন্তু এতে কোমল নিষাদ ব্যবহার হয় এবং এর চলন ভৈরবের চেয়ে কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির। রামকলির বাদী-সমবাদী স্বর ভৈরব থেকে ভিন্ন।
গণেশী ভৈরব: এই রাগে শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার দেখা যায়, যা ভৈরবের কোমল ধৈবত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর আরোহ-অবরোহ এবং চলন ভৈরবের তুলনায় স্বতন্ত্র।
রাগ ভৈরব তার গাম্ভীর্য, পবিত্রতা এবং ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতার কারণে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতে এক চিরন্তন স্থান দখল করে আছে। আজও এটি বহু শিল্পীর প্রিয় রাগ এবং এর পরিবেশনা শ্রোতাদের মনে এক গভীর আধ্যাত্মিক এবং শান্তিময় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এর পরিবেশন শৈলীতে ধীর আলাপের মাধ্যমে রাগের চরিত্র উন্মোচন করা হয় এবং এর প্রতিটি স্বরবিন্যাসে এক মহৎ ভাবের প্রকাশ ঘটে। রাগ ভৈরব কেবল একটি সুর সমষ্টি নয়, এটি এক গভীর দার্শনিক চিন্তাভাবনা এবং ভক্তির প্রকাশ, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আত্মাকে ধারণ করে। এর নিজস্ব মহিমা এবং প্রভাব এটিকে ভারতীয় সংগীত সমাজে এক অপরিহার্য রাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।
৩. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।
মন্তব্য