খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৫, ৯:৫৯ পিএম

ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মূলত এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা। এর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই সুরের উৎস কোনো রাজদরবার বা উৎসবের মঞ্চ ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন ঋষিদের ধ্যানগম্ভীর তপোবন। ভারতীয় সঙ্গীতের আদিমতম প্রামাণ্য উৎস হলো ‘সামবেদ’। বৈদিক যুগে যজ্ঞের সময় যে বৈদিক মন্ত্রগুলো উচ্চারিত হতো, সেগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট স্বরবিন্যাস বা ছন্দ ছিল। ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলোকে যখন সুরারোপ করে গাওয়া হতো, তখনই তার নাম হতো ‘সাম’।
প্রাচীনকালের এই গানকে বলা হতো ‘মার্গ সঙ্গীত’। মার্গ শব্দের অর্থ পথ; অর্থাৎ যে সঙ্গীত মানুষকে মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে নিয়ে যায়। সামবেদের সেই মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে ‘উদাত্ত’, ‘অনুদাত্ত’ এবং ‘স্বরিত’—এই তিনটি প্রাথমিক স্বরের ব্যবহার ছিল, যা কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে সাতটি শুদ্ধ স্বরে (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি) রূপ নেয়। আজ আমরা যে নিখুঁত স্বরগ্রাম বা সপ্তক দেখতে পাই, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগের সেই বৈদিক যুগের মন্ত্রের উচ্চারণে। সুরের এই ধারা যুগের পর যুগ ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে বেঁচে ছিল, যা ভারতীয় সঙ্গীতকে এক অনন্য ও চিরন্তন রূপ দিয়েছে।
বৈদিক যুগের আধ্যাত্মিক আবহ থেকে সঙ্গীত যখন ধীরে ধীরে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ এবং শাস্ত্রীয় রূপ নিতে শুরু করল, তখন বেশ কিছু যুগান্তকারী গ্রন্থ রচিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান এবং আদি গ্রন্থটি হলো ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতক থেকে খ্রিষ্টীয় ২য় শতকের মধ্যবর্তী সময়)। ভরত মুনি মূলত নাটক বা অভিনয়ের আঙ্গিক আলোচনা করতে গিয়ে সঙ্গীতের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি প্রথম স্বর, শ্রুতি, গ্রাম এবং মূর্ছনার এক বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেন। নাট্যশাস্ত্রে উল্লিখিত ‘বাইশ শ্রুতি’র তত্ত্ব আজও ভারতীয় সঙ্গীতের স্বরস্থানের মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ভরতের এই তাত্ত্বিক ভিত্তি সঙ্গীতকে কেবল একটি চর্চার বিষয় থেকে উন্নীত করে এক অনন্য শাস্ত্রের মর্যাদা দেয়।
ভরত মুনির পর মধ্যযুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব হলেন শার্ঙ্গদেব। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তাঁর রচিত ‘সঙ্গীত রত্নাকর’ গ্রন্থটি ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের এক বিশাল মাইলফলক। শার্ঙ্গদেব এমন এক সময়ে এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যখন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরণের পরিবর্তন আসছিল। তিনি তাঁর গ্রন্থে তৎকালীন প্রচলিত রাগ, তাল, বাদ্যযন্ত্র এবং নৃত্যশৈলীর এত নিখুঁত ও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন যে, এটিকে ভারতীয় সঙ্গীতের ‘বাইবেল’ বললেও ভুল হবে না। ‘সঙ্গীত রত্নাকর’-এর মাধ্যমেই প্রাচীন যুগের সঙ্গীত ধারণার সাথে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সঙ্গীতের একটি সুদৃঢ় সংযোগ তৈরি হয়।
মধ্যযুগের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ভারতীয় সঙ্গীতের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেয়। আর তা হলো উত্তর ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা। দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে ভারতীয় সঙ্গীত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে—উত্তর ভারতীয় ধারা বা ‘হিন্দুস্থানি সঙ্গীত’ এবং দক্ষিণ ভারতীয় ধারা বা ‘কর্ণাটকী সঙ্গীত’। দক্ষিণ ভারত দীর্ঘ সময় মুসলিম শাসনের সরাসরি প্রভাব থেকে মুক্ত থাকায় সেখানে প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের শুদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী রূপটিই বজায় থাকে, যা কর্ণাটকী সঙ্গীত নামে পরিচিত। অন্যদিকে, উত্তর ভারতে পারস্য, আরব ও মধ্য এশিয়ার সংস্কৃতির সাথে ভারতীয় সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব আদান-প্রদান ঘটে, যার ফলে জন্ম নেয় তুলনামূলকভাবে নমনীয় এবং কারুকার্যময় হিন্দুস্থানি সঙ্গীত।
এই মুসলিম শাসনকালের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন হযরত আমীর খসরু (১২৫৩–১৩২৫)। তিনি একাধারে সুফি সাধক, কবি এবং অসাধারণ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। আমীর খসরু ভারতীয় সঙ্গীতের মূল ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তার সাথে পারসিক (Persian) সুর ও ছন্দের এমন এক নান্দনিক মিশ্রণ ঘটালেন, যা হিন্দুস্থানি সঙ্গীতকে এক নতুন মাত্রা দিল। ধারণা করা হয়, প্রচলিত ধ্রুপদ শৈলী থেকে তিনি ‘খেয়াল’ গায়কীর প্রাথমিক রূপ তৈরি করেছিলেন এবং কাওয়ালি, তারানা ও তিলানার মতো নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সেতার ও তবলার মতো জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কার বা রূপান্তরের পেছনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে (১৫৫৬–১৬০৫) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তার রাজকীয় স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্ন ছিলেন মিয়া তানসেন। তানসেন ছিলেন ধ্রুপদ গায়কীর এক কিংবদন্তি পুরুষ। তিনি প্রাচীন রাগগুলোর সংস্কার করেন এবং নিজের মেধা দিয়ে তৈরি করেন ‘মিয়া কি মালহার’, ‘মিয়া কি তোড়ি’ বা ‘দরবারী কানাড়া’র মতো কালজয়ী সব রাগ, যা আজও সঙ্গীত জগতে রাজত্ব করছে। মুঘল দরবারের এই পৃষ্ঠপোষকতা সঙ্গীতকে মন্দির ও তপোবনের গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক রাজকীয় ও পেশাদার শিল্পের রূপ দিয়েছিল।
১৭০৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। দিল্লীর দরবার যখন তার পুরোনো গৌরব ও অর্থবল হারিয়ে ফেলে, তখন রাজদরবারে আশ্রিত গুণী সঙ্গীতশিল্পীরা জীবিকা ও পৃষ্ঠপোষকতার খোঁজে ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্য এবং জমিদারদের দরবারে ছড়িয়ে পড়েন। এই ঐতিহাসিক বিকেন্দ্রীকরণ থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে জন্ম নেয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ঘরানা সংস্কৃতি’। ঘরানা শব্দের উৎপত্তি ‘ঘর’ থেকে, যার অর্থ কোনো সুনির্দিষ্ট গুরু-শিষ্য পরম্পরা বা গায়কীর নিজস্ব ধারা।
বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং গুরুদের নিজস্ব শৈলীর ওপর ভিত্তি করে একেকটি ঘরানার বিকাশ ঘটে। যেমন:
এই ঘরানাগুলোর কারণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কোনো একক গণ্ডিতে আটকে না থেকে ভারতের কোণায় কোণায় নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে বিকশিত হতে পেরেছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও আমূল পরিবর্তন আসে। দেশীয় রাজন্যবর্গ ও জমিদারদের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সঙ্গীতের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যায়। এই সংকটময় মুহূর্তে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং এর মর্যাদা রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন দুজন যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব—পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে এবং পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পলুস্কর।
পণ্ডিত ভাতখণ্ডে সারা ভারত ঘুরে বিভিন্ন ঘরানার গান ও বন্দিশ সংগ্রহ করেন। তিনি রাগগুলোর ব্যাকরণকে সহজ করার জন্য ১০টি ‘থাট’ (মেল)-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস করেন এবং একটি সুনির্দিষ্ট স্বরলিপি পদ্ধতি (Notation system) আবিষ্কার করেন, যার ফলে আমজনতার পক্ষে সঙ্গীত শেখা সহজ হয়। অন্যদিকে, পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পলুস্কর সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯০১ সালে লাহোরে ‘গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে সঙ্গীতকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার রূপ দেন, যার ফলে সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও রক্ষণশীলতা ভেঙে সঙ্গীত শিক্ষায় এগিয়ে আসে।
পরবর্তী সময়ে, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, ওস্তাদ আল্লারাখা এবং ওস্তাদ জাকির হোসেনের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সুরের জাদুকে তুলে ধরেন। বিশেষ করে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ওয়েস্টার্ন পপ আইকন ‘দ্য বিটলস’-এর জর্জ হ্যারিসনের সাথে যুক্ত হয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সেতু বন্ধন তৈরি করেন।
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আরও বেশি উন্মুক্ত ও বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে। ফিউশন মিউজিক বা ওয়ার্ল্ড মিউজিকের যুগেও এর হাজার বছরের পুরনো মূল চেতনাটি কিন্তু বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বৈদিক যুগের সেই শান্ত-স্নিগ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বমঞ্চের আধুনিক কনসার্ট হল—ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস মূলত মানুষের মন ও আত্মার অনন্ত সৌন্দর্যেরই এক সুরময় বহিঃপ্রকাশ।
মন্তব্য